রাজধানীর খোলামোড়া ঘাটে দৈনিক ৮০ হাজার টাকার অবৈধ টোল বাণিজ্য
নাইমুর রহমান ইমন
রাজধানীর
কামরাঙ্গীরচরের টেম্পু স্ট্যান্ড সংলগ্ন খোলামোড়া ঘাটে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে
প্রতিদিন ৮০ হাজার টাকা করে অবৈধ টোল আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সেই হিসেবে মাসে এই
বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৪ লাখ টাকা এবং বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি
৯২ লাখ টাকা।
অর্থাৎ, শুধু একটি
ঘাট থেকেই অবৈধভাবে প্রতি বছর প্রায় পৌনে তিন কোটি টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়ে
নেওয়ার গুরুতর এই চিত্রটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব ও অনিয়মেরই
বহিঃপ্রকাশ।
পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে স্বাধীন সাংবাদিক মিনহাজ তালুকদার অবৈধ
ইজারাদার কর্তৃক হেনস্তার শিকার হন।
তিনি ঘাটে অতিরিক্ত টোল আদায় সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ
করতে যান। সিটিজেন পার্সপেক্টিভকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভুক্তভোগী সাংবাদিক এই
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেন।
মিনহাজ বলেন, নৌকাচালকরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করলেও অবৈধ ইজারাদাররা বসে বসে টাকা আদায় করছে। প্রথমে এই অবৈধ ইজারাদারদের ৫ টাকা দিতে হয়। পরে নৌকাচালককেও ৫ টাকা ভাড়া দিতে হয়ে। ফলে নদী পাড় হতে জনপ্রতি খরচ হয় ১০ টাকা। কিন্তু ফেরত আসতে হলেও এই পরিমাণ টাকা খরচ হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন নদী পারাপারে প্রত্যেকের ২০ টাকা খরচ হয়।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, প্রতিদিন আনুমানিক ৭ থেকে ৮ হাজার
মানুষ এই ঘাট দিয়ে যাতায়াত করেন। অবৈধ ইজারাদাররা জনপ্রতি ১০ টাকা হারে টোল আদায়
করায় প্রতিদিন প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা আয় করছেন। তবে আদায়কৃত এই অর্থের
কতটুকু সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে, নাকি পুরোটাই ইজারাদারদের পকেটে যাচ্ছে, তা
নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে অনেকে কথা বলতে চাইলেও তাদেরকে থানায় যেতে বলা
হয়।
মিনহাজ তালুকদারের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি যখন খোলামোড়া
ঘাটে টোল আদায়ের বিষয়ে ভিডিও ধারণ করছিলেন এবং তথ্য জানতে চাচ্ছিলেন তখন ঘাটের
ইজারাদাররা তার ওপর চড়াও হন।
মিনহাজ তাদের কাছে পেশাদার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তারা তা
জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, “বড়গ্রাম গিয়া জিগান”।
ফলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয় যে তারা অবৈধভাবে এই টোল
আদায় করছেন। পরবর্তীতে সিটিজেন পার্সপেক্টিভ যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে
জানতে চাইলে তারাও এই টোল আদায়ের ব্যাপারে কোনো নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি। ফলে
সন্দেহ আরও গভীর হয়।
পূর্বে জনপ্রতি টোল রেইট ছিল ৩ টাকা। কিন্তু বর্তমানে ৫
টাকা করে টোল আদায় করা হচ্ছে। এই অতিরিক্ত টোল আদায় করা নিয়ে প্রশ্ন তোলায়
ইজারাদাররা মিনহাজের সাথে উদ্ধত আচরণ করেন।
ঘাটে স্থাপনা করা সাবেক ঢাকা জেলা পরিষদের প্রধান
নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন খন্দকারের স্বাক্ষর করা বোর্ড থেকে জানা গেছে,
প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ১৪ কেজি মালামালসহ বর্তমান অনুমোদিত টোল রেইট ৫ টাকা।
বোর্ডে স্থানীয় সরকার শাখা, ঢাকা বিভাগ, ঢাকা এর
১২-০৫-২০২৫ খ্রি. তারিখের ৪৬.৪১, ৩০০০.০১৭.০০.৪৫.২০২২-১৫২ নং স্মারক সূত্র উল্লেখ
করা আছে। তবে এই নথির সত্যতা এখনো যাচাই করা যায়নি।
আরও লেখা আছে, ঢাকা জেলা পরিষদের সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত
মোতাবেক চলতি বছরের ৫ মে থেকে ঐ পরিষদের আওতাধীন ঘাটসমূহের অনুকূলে বর্ণিত হারে
টোল রেইট নির্ধারণের অনুমোদন প্রসঙ্গে অনুরোধ জানানো হয়।
এ বিষয়ে জেলা পরিষদ থেকে ঐ ঘাটের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান
সহকারী মোঃ চুন্নু মিয়া জানান যে তিনি শুনেছেন এমন সিদ্ধান্তের কথা তবে নিশ্চিত
কিছু বলতে পারেন না।
তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রতি বছর উন্মুক্ত
দরপত্রের মাধ্যমে ঘাটগুলো ইজারা দেওয়া হয়। যারা ইজারা পান তারাই নির্দিষ্ট সময়ের
জন্য টোল আদায়ের বৈধ অধিকার লাভ করেন।
এ বিষয়ে জানার জন্য বর্তমান ঢাকা জেলা পরিষদের প্রধান
নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ বদরুদ্দোজা শুভকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
সাংবাদিক মিনহাজ জানান, ইজারাদাররা তাকে জানায় যে তারা সরকারকে
কোটি কোটি টাকা ট্যাক্স দেন এবং তার কোনো সমস্যা থাকলে যেন থানায় গিয়ে অভিযোগ করে।
কামরাঙ্গীরচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম ফারুককে
সিটিজেন পার্সপেক্টিভ এই তথ্য জানালে তিনি নিশ্চিতভাবে কোনো তথ্য না দিয়ে বিষয়টি
খতিয়ে দেখবেন বলে জানান।
সাংবাদিক মিনহাজ অভিযোগ করেন, একজন যুবক অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে আক্রমণাত্মক ভাষায় তাকে প্রশ্ন করে, "ঐ তোর সমস্যা কী? ভিডিও ডিলিট কর"।
মিনহাজ শান্তভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও
অবৈধ ইজারাদাররা তাকে তার পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়ে ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার
চেষ্টা করেন।
তিনি আরও বলেন, এই টোল আদায়ের জায়গাটি এর আগে সেনাবাহিনী
একবার উচ্ছেদ করে দিয়েছিল। কিন্তু এরপরও অবৈধ ইজারাদাররা পুনরায় সেখানে তাদের
কার্যক্রম শুরু করেন এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত টোল আদায় করছেন।




