দুর্বল মিসাইল ব্যবহার করে ইরান কীভাবে বিজয় অর্জন করল?
দুর্বল মিসাইল ব্যবহার করে ইরান কীভাবে বিজয় অর্জন করল?
________________________________________
কীভাবে লিখব—গুছিয়ে উঠতে পারছিলাম না। কারণ আমি শিয়াদের বিশ্বাস করি না। আবার আমেরিকার মতো এত ভয়ংকর পরাশক্তিকে পরাজিত করার মাধ্যমে ইরান আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, যা আজকের সব মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আমার মূল বক্তব্য নিচের অংশে, শুরুতে শুধু ব্যাখ্যা।
যেকোনো যুদ্ধ ৪টি ডাইমেনশনে হয়—মিলিটারি, ইকোনমিক, পলিটিক্যাল এবং ন্যারেটিভ।
আমেরিকা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী নিউক্লিয়ার শক্তিধর দেশ। রাজনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে এবং মিডিয়ার দিক থেকেও তারা অত্যন্ত শক্তিশালী। অর্থাৎ চারটি ডাইমেনশনেই তারা শক্তিশালী। একা আমেরিকার পক্ষে পৃথিবীর যেকোনো দেশকে মোকাবিলা করার সক্ষমতা আছে। সেই আমেরিকা মাত্র ৪০ দিনের মধ্যে ইরানের কাছে পরাজিত — যা অবিশ্বাস্য।
সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ব্যাখ্যাগুলো ঘুরছে, তার মধ্যে একটি হলো—ইরানের মিসাইল আমেরিকার তুলনায় অনেক দুর্বল এবং সস্তা। কিন্তু এই দুর্বল মিসাইল দিয়েই ইরান কীভাবে আমেরিকাকে চাপে ফেলল? এর ব্যাখ্যা হলো—ইরান এখানে একটি “মাইন্ড গেম” খেলেছে। তারা জানত এই মিসাইল দিয়ে বড় কিছু করা সম্ভব নয়, তবুও তারা বারবার বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে মিসাইল নিক্ষেপ করেছে, যাতে আমেরিকার মিলিটারি ডাইমেনশন দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই দুর্বল মিসাইল প্রতিহত করতে আমেরিকাকে অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়বহুল ডিফেন্স সিস্টেম ব্যবহার করতে হয়েছে, যা ইরানের মিসাইলের তুলনায় প্রায় ৬০ গুণ বেশি খরচসাপেক্ষ। অর্থাৎ, ইরান ১ মিলিয়ন ডলারের মিসাইল ছুড়লে আমেরিকাকে প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়েছে—প্রায় কোনো ফলাফল ছাড়াই। এটি ছিল একটি অত্যন্ত কার্যকর মিলিটারি স্ট্র্যাটেজি।
অন্যদিকে, আমেরিকা ঐতিহাসিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে এবং ইরানের ওপর অসংখ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ডলার ব্যবহার করতে না পারায় ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল। কিন্তু এই যুদ্ধের ফলে তারা হরমুজ প্রণালীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে, যা আগে ছিল না। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০% তেল পরিবাহিত হয়।
এখন হরমুজ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইরান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করতে পারছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে তারা হরমুজে টোল হিসেবে ডলার গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে। ভবিষ্যতে তারা কিছু দেশকে হয়তো বিনামূল্যে পথ ব্যবহারের সুযোগ দেবে, বিনিময়ে সেই দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার চেষ্টা করবে। এটি একটি অর্থনৈতিক বিজয়।
আরব বিশ্বের অধিকাংশ দেশ দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার প্রভাবাধীন। কিন্তু এই যুদ্ধের পর অনেক দেশই ইরানকে সমর্থন দিতে পারে—এটি ইরানের জন্য একটি রাজনৈতিক বিজয়। যদিও কিছু দেশ আগের মতোই আমেরিকার প্রভাবাধীন থাকবে, তবুও ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আগে তারা এখন একাধিকবার চিন্তা করবে। এমনকি ন্যাটোসহ ইউরোপের অনেক দেশও সরাসরি আমেরিকাকে সহযোগিতা করেনি—এটিও ইরানের একটি রাজনৈতিক সাফল্য।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ন্যারেটিভ। কিছুদিন আগেও ইরানে সরকার পরিবর্তনের দাবিতে অভ্যন্তরীণ আন্দোলন চলছিল, যা আংশিকভাবে আমেরিকার প্রভাবেই উসকানি পেয়েছিল। এবং বাস্তবতা হলো, ইরানের শিয়া শাসনব্যবস্থা জনগণের জন্য আদর্শ নয়।
কিন্তু এই যুদ্ধের ফলে ইরানের জনগণ ব্যাপকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। মানুষ রাস্তায় নেমেছে এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এমনকি আমেরিকার ভেতরেও মানুষ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এবং ইরানে শান্তির পক্ষে আন্দোলন শুরু করেছে।
অন্যদিকে, বহু মুসলিম—যারা আগে শিয়াদের নিয়ে দ্বিধায় ছিল—তারাও এখন ইরানের প্রতিরোধকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে। ফলে ন্যারেটিভ ধীরে ধীরে ইরানের পক্ষে পরিবর্তিত হচ্ছে।
এবার আমার মূল বক্তব্য।
ইরান শিয়াদের নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু আমরা শিয়াদের মুসলিম মনে করি না। এখান থেকে আমরা যে শিক্ষা পাই, তা হলো হযরত মাওলা আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রতি বিশ্বাস ও চেতনা। এই চেতনা তাদের সাহস দিয়েছে, ত্যাগের শক্তি দিয়েছে, এবং শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়েছে।
আসল বিজয় বেঁচে থাকার মধ্যে নয়, বরং শহীদ হওয়ার মধ্যেই—এই বিশ্বাস লক্ষ লক্ষ মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছে। প্রকৃত বিজয় শক্তিতে নয়, বিশ্বাসে। “মাওলা আলীর পথে আছি, এই পথে মৃত্যু-ই শহাদাত, আর শহাদাতের চেয়ে বড় বিজয় নেই”—এই বিশ্বাসই ছিল ইরানের মূল শক্তি।
ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, প্রায় সব যুদ্ধেই মুসলিমরা সামরিকভাবে দুর্বল ছিল, কিন্তু ঈমানের শক্তির কারণে বিজয় অর্জন করেছে। ইরান সেই শিক্ষাকেই ধারণ করেছে—আমেরিকার অনুসরণ না করে ঈমানি শক্তির ওপর নির্ভর করেছে।
শিয়া আকিদা বাতিল হলেও, তারা ইসলামের সেই আত্মিক শক্তিকে ধারণ করে বিজয় অর্জন করেছে।